ক্যাপশন : সিআরবি’র মহাসচিবের সাংগঠনিক প্রকাশনা হস্তান্তর। ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায়- “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ মন্ত্রণালয়” প্রতিষ্ঠায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জরুরি ও ব্যক্তিগত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন – ক্রেতা সুরক্ষা আন্দোলন-সিআরবি মহসচিব ডিজাইনার কেজিএম সবুজ
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা
ড. মুহাম্মদ ইউনূস
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা,
আপনাকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। আপনি সফলতার সাথে দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পালন করে এখন বিদায়ের সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছেন। একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার সততা, বিবেকবোধ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আমরা গর্বিত। দেশের সাধারণ মানুষের কল্যাণে আপনার নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
মাননীয় মহোদয়,
আমরা একটি ক্ষুদ্র স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন-ভলান্টারি মুভমেন্ট-কাউন্সিল অব কনজিউমার রাইটস বাংলাদেশ-সিআরবি। অতীতের (১৫ জুলাই, ২০১৫) স্বাক্ষাতের মাধ্যমে আমরা আপনার নিকট ভোক্তা অধিকার সুরক্ষায় সহযোগিতা চেয়েছিলাম। আপনি সেদিন আন্তরিকভাবে কথা দিয়েছিলেন, সুযোগ পেলে এ বিষয়ে সহযোগিতা করবেন।
আপনি দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে আপনার সরকারি বাসভবন ‘যমুনায় বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন চলমান থাকায় আপনাকে আর বিব্রত করার মানসিক শক্তি আমাদের হয়নি। তদুপরি, একটি ছোট সংগঠন হিসেবে আপনার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগও আমাদের ছিল না। কিন্তু এখন বিদায় বেলায় নিরুপায় হয়েই দেশের ১৮ কোটি ভোক্তার স্বার্থে, জাতীয় স্বার্থে এই খোলা চিঠির মাধ্যমে আমাদের দাবি আপনার নিকট পেশ করছি।
আমাদের একক ও জরুরি দাবি:
বাংলাদেশের ভোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় “ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ মন্ত্রণালয়” নামে একটি পৃথক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হোক। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রত্যাহার করে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ন্যস্ত করার জন্য বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।
আমাদের দাবির পক্ষে যুক্তি ও বাস্তবতা:
১. সাংসদ-ব্যবসায়ী নির্ভর সংসদ: বাংলাদেশের সংসদের অধিকাংশ সদস্যই ব্যবসায়ী। ফলে স্বাভাবিকভাবেই আইন-নীতি প্রণয়ন ও প্রয়োগের সময় ব্যবসায়ীদের স্বার্থ অগ্রাধিকার পায়। ভোক্তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত থেকে যায়। বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদেও এই চিত্রের ব্যতিক্রম হয়নি। তাই বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে থেকে ভোক্তাদের প্রকৃত সুরক্ষা দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়, কারণ বণিকদের ডেরায় বসে ভোক্তার কল্যাণ সম্ভব নয়।
২. শুধু জরিমানা, ন্যায়বিচার নয়: সম্প্রতি এলপি গ্যাসের সিন্ডিকেট করে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ভোক্তাদের কাছ থেকে লুট করা হয়েছে। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা বাজার নিয়ন্ত্রণের নামে জরিমানা করলেও, সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি জেল বা পণ্য অধিগ্রহণের মতো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে সরকার ও ব্যবসায়ী উভয়ই অর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে-ক্ষতিগ্রস্ত শুধু ভোক্তা।
৩. বাজার অস্থিতিশীল ও জালিয়াতি: আসন্ন রমজান মাসকে কেন্দ্র করে দেশের ৬টি অসাধু কোম্পানি ৬০০-এর বেশি লাইটার জাহাজকে গুদামজাত করেছিল। সংবাদ প্রকাশে সেখানে অভিযানের নামে গণজরিমানা হলেও, মূল অপরাধীদের জেল দেওয়া হয়নি। অন্যদিকে, ইউনিলিভার বাংলাদেশের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানও বিএসটিআই-অনুমোদিত ২০০ গ্রামের জার্মিচেক পেস্ট বাজারজাত করছে মাত্র ১৯০ গ্রাম ওজনে। ডাবর রেড সহ অসংখ্য প্রতিষ্ঠান প্রতিদিন ভোক্তাদের ঠকাচ্ছে। আমরা গত ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ তারিখে লিখিতভাবে বিএসটিআই-এ প্রতিকার চেয়েও জবাবদিহিতার অভাবে কোনো ফল পাইনি।
৪. মোবাইল সেবায় অরাজকতা: বিটিআরসি মোবাইল সেবার নামে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। গ্রাহক ১০০ টাকা রিচার্জ করলে ৫০ টাকা কেটে নিচ্ছে বিটিআরসি আর অপারেটারা ৫০টাকায় অস্বচ্চ সেবা দিচ্ছে। অথচ সিঙ্গাপুরে ১০০ টাকায় ১৭ টাকা, থাইল্যান্ডে ২০ টাকা এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত ১০০ টাকায় গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৮ টাকা কর্তন করছে। আমাদের দেশে ইন্টারনেট মূল্যও স্বৈরাচারী সরকারের সময়ের চেয়ে এখন বেশি। এ ব্যাপারেও বিটিআরসি-তে লিখিত প্রতিকার চেয়েও জবাবদিহির অভাবে কোনো সমাধান মেলেনি।
৫. সকলেই ভোক্তা: বাংলাদেশের সবাই কৃষক নন, কিন্তু কৃষি মন্ত্রণালয় আছে। সবাই যুবক বা ক্রীড়াবিদ নন, কিন্তু যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আছে। কিন্তু বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষই ভোক্তা হওয়া সত্ত্বেও তাদের অধিকার সুরক্ষার জন্য কোনো পৃথক মন্ত্রণালয় নেই। এটা একটি বড় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের দাবি রাখে।
মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা,
আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের আইন, বিচার ও প্রশাসনিক খাতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। আমরাও চাই, ভোক্তা অধিকার খাতে আপনার সরকার একটি যুগান্তকারী সংস্কার রেখে যাক। আমরা আশাবাদী, আপনি একজন বিবেকবান ও মানবিক রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেশের ১৮ কোটি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে আপনার উত্তরসূরিদের জন্য একটি স্থায়ী কাঠামো তৈরি করে যাবেন।
বিদায়ের প্রাক্কালে আপনার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা।
নিবেদক,
ডিজাইনার কে জি এম সবুজ
মহাসচিব, ক্রেতা সুরক্ষা আন্দোলন-সিআরবি
প্রতিষ্ঠাতা, প্রধান নির্বাহী, সেলফ এইড ফাউন্ডেশন।
।